সাম্প্রতিক

বিদ্যালয়ের ইতিহাস

প্রশাসনিক ভবন

প্রশাসনিক ভবন, বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়

ভূমিকা:

ফিরে যাই একশ বছর আগে। ইংরেজ শাসনামল। বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ রদের সামাজিক অভিঘাতে জর্জরিত পূর্ব বাংলার গ্রামগুলো। এ সময়কাল পর্যন্ত ধুলোমাখা কর্দমাক্ত, মেঠো বাংলায় না ছিলো ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা, না ছিলো শিক্ষা। গ্রামগুলো ছিল শহর থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন ও কৃষি নির্ভর এবং লেখাপড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনে অক্ষম এক জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। বাংলায় তখন জমিদারী প্রথা ছিলো। জমিদাররা কেউ কেউ নিপীড়নের জন্য বিখ্যাত হলেও, দান ও প্রজাবাৎসল্যেও কারো কারো খ্যাতি ছিলো। পাবনা শহর থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে সরাসরি সড়ক যোগাযোগহীন, নদী-বিলে, পূর্ণ ফরিদপুরের বনওয়ারী নগরে জমিদার রাজর্ষি রায় বনমালী রায়বাহাদুরের নামে এই বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। সালটা ১৯১২ খ্রি:। তারিখটা আরো অন্যসব কিছুর মতই অামাদের অজানা। উপলক্ষ আরেকটা ছিলো- ১৯১১ সালে দিল্লির দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ ও রাণী মেরির করোনেশন বা রাজ্যাভিষেক।

করোনেশন বনমালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম ঘরটির চেহারা কেমন তা আমাদের জানা নাই। ঠিক কোথায় তার অবস্থান ছিলো-তও অজানা। তবুও একশ বছর পর আমাদের ভাবতে অসুবিধা হয়না- সেই অখ্যাত পাড়াগা একখানা বিদ্যালয়ের কল্যাণে আস্তে আস্তে করে বদলে যেতে থাকে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠির খোলনলচে পাল্টে দিতে দিতে এই বিদ্যালয়ের চুন সুরকিতে নির্মিত বিশালাকার কক্ষগুলো পার করে ইংরেজ আমল, পাকিস্তান আর স্বাধীন বাংলাদেশের চার দশক। স্কুলের ছাদে ব্যবহৃত লোহার পাতগুলো ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১- এর স্মৃতি বুকে নিয়ে আরো মজবুত হয়ে ওঠে।

সেকালে শিক্ষা কেবল সনদ দিতনা। শিক্ষা সম্মান দিত। শিক্ষা মানুষকে জাতে তুলতো। জামা-কাপড় পড়াতে শেখাতো। সব মিলিয়ে সুবিধা-বঞ্চিত মানুষের মুখে দিতো ভাষা। যাতে সে কথা বলতে পারে। আরও উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজনকে অনুভব করতে পারে। বুঝতে পারে, ভাত-কাপড়-বাসস্থানের মত সমান গুরুত্ব নিয়ে লিখতে হয়-পড়তে হয়। বনওয়ারী নগর সি, বি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টি ফরিদপুরকে গত একশ বছর ধরে ভাষা দিয়েছে, আলো দিয়েছে, দিয়েছে ভাবনাও।

গণতন্ত্র, আধুনিকতা আর বিশ্বায়নের দরজা দিয়ে আসা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, তথ্য-প্রযুক্তি ও মুঠোফোনের কল্যাণে সমগ্র পৃথিবীর জ্ঞানের সাথে বিদ্যালয়টির যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। এই বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট সবাইকে তথ্য দিবে অনাগত সময় ধরে। একশ বছর এক মানুষের জীবনে দীর্ঘ সময়। কিন্তু মহাকালের প্রবাহে একশ বছর খুব বেশি কিছু নয়। অজস্র অসংখ্য আলোকপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী আর ভালো মানুষ তৈরির এক জলজ্যান্ত কারখানা হয়ে এই বিদ্যালয় আরো অনেক কচি প্রাণকে স্বপ্ন দেখাবে।

বিদ্যালয়ের ইতিহাস:

বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়

বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়

ঐতিহ্যবাহী বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টি একটি প্রাচীনতম ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। উত্তরবঙ্গের সুপ্রসিদ্ধ পাবনার চলনবিল বিধৌত বড়াল নদীর দক্ষিণ পাড়স্থ বিখ্যাত সূফী শাহ্ ফরিদের নামানুসারে ফরিদপুর উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১২ সালে।

ঐতিহ্যবাহী বনওয়ারী নগর সি, বি (করোনেশন বনমালি) পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টর বর্তমান স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৪.৪৮ একর। এর মধ্যে ০.৩৩ একর জমির উপর তিনটি মার্কেট রয়েছে। ১নং মার্কেটে দোকানের সংখ্যা ২১ টি, ২ নং মার্কেটের দোকানের সংখ্যা ২১ টি এবং ৩নং মার্কেটে দোকানের সংখ্যা ১২ টি সহ মোট ৫৪ টি প্রতিষ্ঠিত দোকান রয়েছে যা থেকে প্রতিবছর একটি ভালো পরিমাণ অর্থ বিদ্যালয় ফান্ডে জমা হয়। বাকী ৪.১৫ একর জমির উপর বিদ্যালয়ের মূল ভবন সমুহ, খেলার মাঠ, পুকুর এবং স্টাফ কোয়ার্টার অবস্থিত।

এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠালাভ করার পর দু’বছরের মধ্যেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে জানুয়ারি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে শুধুমাত্র মানবিক শাখার অনুমোদন ছিল। এরপর ষাটের দশকের মধ্য ভাগে বিজ্ঞান শাখা চালু করা হয় এবং ঐ সময়ের হেডমাষ্টার জনাব সাইদুর রহমান সাহেবের জোরালো প্রচষ্টায় ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারী বিজ্ঞান শাখাটি তদানিন্তন শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে। উল্লেখ্য যে, এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি জন্ম লাভ করার পর থেকে সরকারি অনুদান না পাওয়া পর্যন্ত তারাশ জমিদার পরিবার থেকে বার্ষিক ২৪০০/-(দৃই হাজার চারশত টাকা) সাহায্য পেত। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে জমিদার প্রথা উচ্ছেদের পর তারাশ জমিদার পরিবার কলকাতা চলে যান। এ সময় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কিছু সরকারি অনুদান এবং ছাত্র বেতনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বলে জানা যায়। এরপর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে দেশের সকল স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়ভাবে এমপিওভূক্ত হয়-যা ১৯৮৫ খ্রি: থেকে কার্যকারী হয়। অলোচ্য করোনেশন বনমালী হাইস্কুলটিও একই নিয়মে এমপিওভূক্ত হয়।

ফলাফল:

A+ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের একাংশ

জেএসসি পরীক্ষায় A+ ও বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের একাংশ

জন্মলগ্ন থেকেই এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে গৌরবের শীর্ষে অবস্থান করে, যা অদ্যাবধি সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ ১৯১৬-১৯১৭ এবং ১৯২১-১৯২২ শিক্ষাবর্ষে বৃহত্তর পাবনা জলার শীর্ষ পর্যায়ের ১৮ টি অনুদানবিহীন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ফলাফল সম্পর্কে জানা যায় যে, ১৯১৬-১৯১৭ শিক্ষাবর্ষে বনওয়ারী নগর সি, বি, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সর্বমোট ১২ জন পরীক্ষার্থী এন্ট্রাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে ৬ জন প্রথম বিভাগ ও ৪ জন দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করে। পাসের হার ছিল ৮৮.৮৮। প্রতিষ্ঠানটি ফলাফলের দিক থেকে বর্তমানে পূর্বের সেই ধারা বজায় রেখে চলেছে।